দায়িত্ব নেয়ার আগেই বিতর্কিত করার নানান চেষ্টা চলছে নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাকে ঘিরে। বলা হচ্ছে সরকারের পছন্দের বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়ার কারণেই তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে যিনি জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। এ কারণে শপথ নেয়ার আগে কোন কোন মহল থেকে তাকে সরিয়ে নতুন কাউকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। যদিও নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই অস্বীকার করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনাকালে কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। আইন ও সংবিধান অনুসরণ করেই নির্বাচন করা হবে তার প্রধান কাজ। এ কাজে কোন বিশেষ মহলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করারও সুযোগ তার নেই। বিরোধীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, দেশে সবার গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে, মতামত দেয়ার অধিকার রয়েছে। কে, কি বলল সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চান না। সবাই যে একজনকে পছন্দ করবে তা ভাবা ঠিক হবে না।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সচিব কে এম নূরুল হুদা। সব রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাওয়া নামের তালিকা বিবেচনা করে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সার্চ কমিটি তাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। এছাড়া একই পদে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের নাম সুপারিশ করা হয়। দু’জনের মধ্য থেকে যোগ্য বিবেচনায় এবং পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ কে এম নূরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নবনিযুক্ত অন্য চার কমিশনার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝে নেননি। বর্তমান কমিশনের ধারাবাহিকতা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকার কারণে ১৫ ফেব্রুয়ারি তারা শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব বুঝে নেবেন। কিন্তু তার আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিতর্কিত করা তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন মহলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যোগ্য বিবেচনায় এ পদে রাষ্ট্রপতি যাকে নিয়োগ দিযেছেন সবার উচিত তার ওপর আস্থা রাখা। রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে কাউকে অযথা বিতর্কিত করা ঠিক হবে না। তাকে সুযোগ দেয়া উচিত তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন কিনা? তার আগে কোনভাবেই সাংবিধানিক পদে নিয়োগ পাওয়া কাউকে এভাবে বিতর্কিত করা ঠিক হবে না।

কে এম এম নূরুল হুদাকে সিইসি করার পর সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করা হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে। তারা ইতোমধ্যে জানিয়েছে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের প্রতিফলন ঘটেছে। তাদের মতে যিনি জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক, চাকরি বিধি লঙ্ঘন করেছেন তিনি কিভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করবেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শুক্রবার দলের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে সিইসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কে এম নূরুল হুদাকে সাংবিধানিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে ও সরকারের হুকুমে রকীব উদ্দিন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। এবার যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হলেন তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় চেতনায় কাজী রকীব উদ্দিনের চেয়েও আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে। একই সঙ্গে উল্লেখ করেন নতুন সিইসির অতীত কর্মকা- ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষণার পরপরই তার বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি যে কমিটেড আওয়ামী লীগার সেটি ফুটে উঠেছে। তার অধীনে নির্বাচন হলে সেটি ভোটারবিহীন এক তরফা নির্বাচনই হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগ থেকে এর প্রতিবাদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ইসি গঠন করেছেন। সিইসি এবং ইসিকে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য না দেয়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

রকীব কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার অনুযায়ী সার্চ কমিটির বাছাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য চারজন কমিশনার। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়া ৩১ রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে নাম প্রস্তাবের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করে সেখান থেকে ইসি নিয়োগ দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ীই প্রধান নিবাচন কমিশনার হিসেবে কে এম নূরুল হুদাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আওয়ামী মতাদর্শের উল্লেখ করলেও তার নাম আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কোন তালিকায় ছিল না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যাদের ইসিতে নিয়োগ দিয়েছেন তাদের মধ্যে একজনের নাম বিএনপি তালিকা থেকে নেয়া। এছাড়াও অন্য আর একজনের নাম নেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের তালিকা অনুযায়ী। তবে তার আগে যোগ্য বিবেচনায় এবং অন্য রাজনৈতিক দলের দেয়া তালিকায় মিল থাকায় বাছাই কমিটি তাদের নাম সুপারিশ করেছে। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তার নাম বড় দুই রাজনৈতিক দলের তালিকায় ছিল না। এর বাইরে বিভিন্ন দলের অভিন্ন তালিকায় থাকায় এবং যোগ্য বিবেচনা করেই সার্চ কমিটি তার নাম সুপারিশ করেছে। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি তার পছন্দ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গঠিত ইসিকে নিয়ে এত আগেই বিতর্কের সুযোগ নেই। তারা বলেন, দলীয় অবস্থান থেকে ইসির বিরোধিতায় রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে নতুন ইসিকে কাজ করার জন্য সময় দেয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, শত বাধা বিঘেœর মধ্যে কাজী রকীবউদ্দিন কমিশনকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এখন নতুন ইসির জন্য সবার অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচন করাটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সবার আস্থা অর্জন করে ও কোন ধরনের প্রাণহানি যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করাই হবে অগ্রাধিকারমূলক কাজ। নতুন কমিশনে যারা আসবে তাদের নিয়ে সমালোচনা হবে, বিরোধিতা হবে এটা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু ইসিকে কাজের কাজ করতে হবে।

এদিকে নতুন যারা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তাদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বর্তমান ইসিকে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য সামনে তাদের জন্য রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। কোন রাজনৈতিক চাপের মুখে তাদের নতি স্বীকার করা চলবে না। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা আনতে তাদের বড় ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনে মানুষের আস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে তাদের পরামর্শ করতে হবে।

Leave a Reply

  • (not be published)