কেউ এক-দু ফোঁটা নিলে কমে না। বরং মহত্ব বাড়ে 
।। সুদীপ কুমার দীপ।।

 

চুপচাপ থাকাটাই আমার স্বভাব। আসলে, ছোট বেলা থেকে ‘আমি সেই লোক’ টাইপের ঢোল পেটানোটা কখনোই ভালো লাগে না। সেই ওয়ান-টু’তে পড়ার সময় পাশের বাড়ির ছেলেগুলো যখন চিল্লিয়ে ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ আবৃত্তি করতো আমি তখন আনমনে আম আর লিচুর অংক কষতাম। ওরা যখন বিশ্বকাপে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা গোল করার পর ‘তোমার ভাই আমার ভাই’ স্টাইলে গলা ছাড়তো আমি তখন বিপক্ষ দলের গোলকিপারের দিকে নজর রাখতাম। তার ভুলটাকে লক্ষ্য করতাম।….
এতো সব কথা বলছি অন্য কারনে। প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে একটা গল্প বলি।
আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে চায়না। ওর সঙ্গে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত হরিঢালি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। আমার রোল যখন এক, ওর তখন ত্রিশ। বলা বাহুল্য যে, ক্লাসে তখন তেত্রিশ না চৌত্রিশ জন স্টুডেন্ট ছিল। আমি ফাইভে বৃত্তি পেলাম আর চায়না কোন রকম পাশ করলো। পরের বছর চায়না ভর্তি হলো সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি গার্লস স্কুলে আর আমি সেই মানদাতা আমলের আগড়ঘাটা হাই স্কুলে। পুরো একটা বছর চায়নার সঙ্গে দেখা হয়নি। শেষ যেদিন দেখা হলো সেদিন আমার চোক্ষু চড়ক গাছ আর আমার বাবার চোক্ষু কপালে উঠলো। বাবা-ই চায়নাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার রোল কত!’ চায়না বললো, ‘কাকা, তিন’। বাবা প্রথম বার শুনেও শুনলেন না। আবার জিজ্ঞেস করলেন। চায়নার সেই একই উত্তর। দৃঢ় কণ্ঠে বললো, ‘তিন’। শুনে আমি নেই। যে মেয়ে পাঁচ আর তিন সারা জীবন সাত বলেছে সে এক বছরে কি এমন করলো যে মিরাকেল রেজাল্ট হলো! আমার চেয়ে বাবা আরো অবাক হলেন। কিন্ত কিছুই বললেন না। একটু পরে চায়নার আরেক বান্ধবীকে ডেকে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তোমার রোল কত!’ মেয়েটি বললো, ‘কাকা, এক’। বাবা ফের স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কিন্ত এবার আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। আমি মেয়েটিকে পিছু ডাকলাম। বললাম, ‘এই, তোদের ষ্টুডেন্ট কয় জনরে!!??’ মেয়েটা আমার কথায় মোটেও অবাক হলো না। বরং আনন্দ চিত্তে উত্তর দিল ‘পাঁচ জন’। এই বার আমার বাবা ব্যাপার খানা বুঝলেন। এমন স্কুলে চায়নার রোল তিন হওয়াটা অস্বাভাবিক না। যাহোক, আসল প্রসঙ্গে আসি।
আজকাল কয়েক জন গীতিকারদের দেখি, একটি করে গান লেখেন আর নিজেকে নিয়ে দশটি করে নিউজ করান। ব্যাপার না। আরো চোখে পড়ছে, খাই-দায়-যাই মেলানো কোন কোন গীতিকার ফেসবুকে লিরিক লিখে বলছেন ‘প্লিজ, ডোন্ট কপি’। ব্যাপার না। আরো চোখে পড়ছে, কেউ কেউ দু-কলম বাড়িয়ে লিখছেন, ‘ফেসবুকে আর লিরিক দেবার মত নেই। সবাই কপি করে।’ এটাও কিন্ত ব্যাপার না।
মোদ্দা ব্যাপার হলো, জনাব, আপনি কিন্ত গান লেখেন সবিতা-নমিতা কিংবা আবুল-কাবুলদের জন্য। এতে নিউজ করার কি আছে!? তাছাড়া তুমি এখনো ‘ই’ আর ‘য়’- এর মধ্যকার পার্থক্য জানো না। তোমার কপি করবে কোন বলদ!!?? এর চেয়ে বড় ব্যাপার হলো, তুই লিখিস ফেসবুকে আর গান দেবার মত নেই। কপি হয়ে যায়। বা’জান, তুই কি রবীন্দ্র নাথ, নজরুল না গৌরী কিংবা পুলক দা’ যে তোকে মানুষ কপি করবে???
এত্তো ঢোল পেটাস ক্যারে ছ্যাড়া!! দেখিস না, রফিকুজ্জামান স্যার, কবির বকুল স্যার এখনো ফেসবুকে শত শত লিরিক পোস্ট করছেন। কই তারা তো এই সব বলেন না! শোন, জ্ঞান সমুদ্র। কেউ এক-দু ফোঁটা নিলে কমে না। বরং মহত্ব বাড়ে। আর শোন, অল্প পানির মাছেরা নড়ে বেশি, গভীর পানিতে নামার চেষ্টা কর। দেখবি, নিজেই পাল্টে গেছিস।

Leave a Reply

  • (not be published)