৬ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ বুধবার, ২০ Jun ২০১৮, ১১:০৫ অপরাহ্ন

তারাশঙ্করের ‘কবি’..

সময় ll সাহিত্যচর্চার প্রথমপর্বে কবিতা রচনা করলেও কালক্রমে কবি না হয়ে কথাশিল্পী হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে; আর তার মহাপ্রয়াণ ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে এই অপরিমেয় প্রতিভার অধিকারী শিল্পী উপলব্ধি করেছিলেন- ‘সাহিত্যসেবার পথেই দেশের সেবা।’ গায়ে বংশীয় জমিদারির গন্ধ লেগে থাকলেও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত না হয়ে তিনি দেশের প্রতি সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করলেন। লোক দেখানো রাজনীতির পরিচিত ছবির বাইরে তিনি সত্যিকার অর্থে দেশসেবক হয়ে উঠলেন আপন গুণে। এ প্রসঙ্গে লেখক নিজেই জানাচ্ছেন- ‘মদ গাঁজাটা খাই না- কিন্তু তারও চেয়ে কোনো একটা তীব্রতর নেশায় মেতে থাকি, ঘুরে বেড়াই। বন্যাটা আমাদের দেশে হয় না এমন নয়, তবে কম। আগুন ঝড় এবং কলেরা এই তিনটিই আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে বড় বিপদ। এরই মধ্যে ঘুরে বেড়ানো আমার নেশা ছিল। বিশেষ করে ১৯২৪/২৫ সালে আমাদের অঞ্চলে যে ব্যাপক মহামারীর আক্রমণ হয়েছিল তাতে আমি অন্তত আমাদের গ্রামের চারপাশে ত্রিশ-চল্লিশখানি গ্রাম একাদিক্রমে ছ’মাস ঘুরেছি, খেটেছি। এই সেবা আমার ব্যর্থ হয়নি। পাথরের দেবমূর্তি ভেদ করে দেবতার আবির্ভাবের কথা যেমন গল্পে আছে তেমনিভাবেই এই পাপপুণ্যের রক্তমাংসের দেহধারী মানুষগুলোর অন্তর থেকে সাক্ষাৎ দেবতাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি।’

প্রকাশের দিক থেকে কবি তারাশঙ্করের বারোতম উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস চৈতালী-ঘূর্ণি বেরোয় ১৯৩১ সালে তার তেত্রিশ বছর বয়সে। কবি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে; পাটনা থেকে প্রকাশিত প্রভাতী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ১৯৪২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি অবশ্য লেখকের পূর্ব-প্রকাশিত একটি ছোটগল্পের বিস্তৃত রূপ; গল্পটি ১৯৪১ সালে প্রবাসী মাসিকপত্রে মুদ্রিত হয়। ছোটগল্প থেকে উপন্যাসে রূপান্তরের প্রয়োজনে প্রবেশ করেছে নতুন নতুন চরিত্র ও ঘটনা; বিস্তৃত হয়েছে আকৃতি। এই উপন্যাসে লেখক বর্ণনা করেছেন নিন্মবর্গের একজন মানুষের কবি হয়ে ওঠার চিত্তাকর্ষক কাহিনী। রাজনীতি-নিরপেক্ষ ব্যক্তি-জীবনের, গোষ্ঠীজীবনের কিংবা লোকায়তজীবনের শিল্পভাষ্য এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য বলে মনে হয়। মূল চরিত্র নিতাই চরণের কবিপ্রতিভা এবং প্রণয়-আবেগ গল্পটিকে দান করেছে পাঠকপ্রিয়তা। বেদনাময় পরিণতি নিতাই-এর জীবনে বয়ে আনে অতল-অনিশ্চয়তা আর পাঠককে দাঁড় করায় নানা প্রশ্নের মুখোমুখি।

‘গোবরে পদ্মফুল’ বাংলাদেশেরই প্রবাদ। নিতাইও তাই। তার ছিল কবিগান শোনার নেশা। ওই গান শুনেই তার সত্তার উর্বর জমিনে কবিত্ব প্রতিভার জন্ম হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার বক্ষে বেদনা অপার। নিতাইয়ের দশাও তাই হল। স্বতঃস্ফূর্ত, অলৌকিক প্রতিভাপ্রাপ্ত কবিত্ব শক্তির নেশায় সে হল ব্যতিক্রমধর্মী। কথায় কথায় হৃদয় থেকে উৎসারিত কবিতার চরণ মুখ থেকে বের হয়ে পড়ে। অসাধারণ তার ব্যঞ্জনা, লালিত্য সুর, ছন্দ। চেষ্টা করে তো কবি হওয়া যায় না।

প্রাণধর্ম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তারাশঙ্কর বাংলা কথাশিল্পে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। অহং তো প্রাণধর্মবিরোধী। এই প্রাণধর্মের সবটুকু বৈশিষ্ট্য বেড়ে ওঠা বৃক্ষের মতো বিকশিত হয়েছে তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসে। উপন্যাসটি লেখা হয় ১৯৪২ সালে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, মূল্যবোধ, সামাজিক শৃংখলা সবই ভেঙে পড়েছে। সমাজের তলানি থেকে পাক খেয়ে উঠছে কদর্য বাস্তবতা। এই প্রতিচিত্র কবি উপন্যাসেও এসেছে। তারাশঙ্করের সত্তার গভীরে যে কবিত্ব শক্তি ছিল, তা তার নিতাই চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। কবি চরিত্র নির্মাণ করেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্বে। নাম গহর। মরমি স্বভাবকবি। বৈষ্ণবভক্ত। এঁকেছেন অল্প পরিসরে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার স্বাধীনতার স্বাদ উপন্যাসে কবি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। নাম মনসুর। নজরুলভক্ত। তার পরিসর গহরের চেয়ে বড় হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র কবি মনসুর নন। কিন্তু তারাশঙ্করের উপন্যাসের নামই কবি । তার নায়ক নিতাই কবি উপন্যাসের সবটুকুজুড়ে আছে। কবি উপন্যাসে তারাশঙ্কর নিতাইকেই বিকশিত করেছেন। তারই আলোর ছটায় উজ্জ্বল হয়েছে ঠাকুরঝি এবং বসন্ত চরিত্র দুটি।

উপন্যাসটিতে ব্যক্তির উত্থান-পতন, জয়-পরাজয় আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির আড়ালে লেখক বিচিত্র অবসরে পাঠককে জানিয়েছেন মানবজীবনবিষয়ক অনেক অনেক বারতা। সমাজ-সংসারে আমাদের প্রতিদিনের আচার-আচরণের মধ্যে যেসব নিরীক্ষা এবং দর্শন প্রকাশ পায়, সেসবের খণ্ডচিত্র রূপ লাভ করেছে কাহিনীটিতে। সংসারে ভালোবাসার যে কোনো বিকল্প নেই, সে কথা কাহিনীকার বহুভাবে পরিবেশন করতে চেয়েছেন। বলেছেন: ‘সংসারে সুখ ভালোবাসায়, মিষ্টি কথায়।’ একথা বোধহয় ঠিক যে সাফল্য পেতে গেলে ধৈর্য-নমনীয়তা আর সহজ ব্যবহারের খুব প্রয়োজন। ত্যাগের আদর্শ যে বড় আদর্শ, সে বিষয়েও নিশ্চয়ই আজ আর কোনো সংশয় নেই। সমাজ আমাদের যেমন প্রদান করে নানা সুবিধা, তেমনি নেয়ও অনেক; বিশেষ করে কারও সাফল্যে সমাজ যেন ভাগ বসাতে চায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে। কারও প্রাপ্তিতে তাই সহজ সম্বোধন করতে দেরি করে না সমাজের ধারক-বাহক মানবপ্রজাতি। এই গল্পেও আমরা দেখি সমাজের সাধুজন নিন্মশ্রেণীর মানুষ নিতাইয়ের সাফল্যে তাদের প্রাপ্তির ইঙ্গিত ঘোষণা করেছে। কলকাতাপ্রবাসী চাকুরে বাবুর কথায় এ রকম আভাসই বোধহয় লেখক দিয়ে থাকবেন। তিনি বলছেন- “ণবং। এ রীতিমতো একটা বিস্ময়!! ঝড়হ ড়ভ ধ উড়হ-অ্যাঁ-ঐব রং ধ ঢ়ড়বঃ” কূটবুদ্ধি আর গলাবাজির শক্তি-কৌশলে দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে নিতাই। আর সে কারণেই সে হয়ে উঠেছে কবিয়াল।

জীবনবাদী নিতাইচরণের গানেও আমরা পাই সমাজের কতিপয় দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ এবং উপলব্ধির বাস্তবতা। আমরা কেবলই অসহায়ভাবে ফর্সা রঙের মানুষের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি; গায়ের সাদা রঙকে সুন্দর ভাবি। এ প্রবণতাকে কটাক্ষ করে নিতাইয়ের বাঁধা একটি গানের কলি- ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে?/কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?’ কবিয়াল-সংস্কৃতির এক বিরাট সত্য লেখক আমাদের সামনে হাজির করেছেন- সারা দুনিয়ায় মুখে মুখে রচিত এসব লোকগান সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে বিস্তর; শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে তৎকালে কবি এবং তাদের সহযোগীরা সেসব লিখে রাখতে পারেনি। পরে হয়তো কিছু সংগ্রহ-সংরক্ষণ হয়েছে, কিন্তু বর্তমান বিশ্বে আজও লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা ও লালন প্রত্যাশিতরকম প্রসারিত হয়নি। অথচ, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সুবিধা প্রয়োগ করে এ কাজে অনেকটা অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা নেতিবাচকতাকে প্রশ্রয় দেয় ভীষণভাবে; মানুষের স্বাভাবিক বিচরণকে বাধাগ্রস্ত করে অনেক সময়। নারীর মর্যাদা এবং অবস্থান বিষয়ে কতক ভাবনাধারা: ‘ঠাকুরঝির চা খাইতে বেশ ভালই লাগে, কিন্তু মেয়েদের ভাল লাগার কথা নাকি বলিতেই নাই।’ লোকবিশ্বাস বা লোকআস্থার প্রসঙ্গও রূপ লাভ করেছে কবি উপন্যাসে। ‘এ তোমার নিঘ্যাত অপদেবতা, না হয় ডান ডাকিনী, কি কোনো দুষ্টু লোকের কাজ!’

প্রেমকে আমাদের সমাজ এখনও সহজভাবে গ্রহণ করেনি। নর-নারীর ভালোবাসা কলংকই সৃষ্টি করেছে বেশি। তাই বলে, ভালোবাসা কিন্তু থেমে যায়নি। মানুষ সমাজের এই সংকীর্ণতাকে পরিহাস করেছে অনায়াসে। তারাশঙ্কর তার কবিতে প্রেমের কলংক প্রসঙ্গে কবিয়াল নিতাইকে দিয়ে বলিয়েছেন- ‘চাঁদ দেখে কলঙ্ক হবে বলে কে দেখে না চাঁদ?’ কবিতা রচনা, কবিয়ালির ব্যাপারাদির ফাঁকে ফাঁকে তারাশঙ্কর বাংলা সাহিত্য এবং এর অসীম ভাণ্ডারের সামান্য আভাসও দিয়েছেন পাঠককে; চন্ডীদাস-বিদ্যাপতি-জ্ঞানদাস প্রভৃতির পদাবলির প্রসঙ্গের আড়ালে তৎকালের সমাজনীতি, প্রেমভঙ্গি, জীবনদৃষ্টির প্রতি সচেতন পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন হয়তো। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’, ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর।’, ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।’- প্রভৃতি কথার মধ্য দিয়ে লেখক হয়তো নিতাইয়ের জীবনদৃষ্টি, সাংসারিক ব্যর্থতার বাস্তবতা, প্রেমবোধ বোঝাতে বোঝাতে পাঠককে উপলব্ধির এক নতুন দরজায় নিয়ে হাজির করেছেন। ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মপালনে আসক্তি তুলে ধরতেও ভুল করেননি তারাশঙ্কর; ঝুমুর দলের নারীদের যদিও দেহব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, নেশা-পাপাচার যদিও তাদের সঙ্গী, তবু স্রষ্টা এবং পরকাল সম্বন্ধে তারা যে একেবারে অজ্ঞাত বা উদাসীন নয়, সেকথা কোনো এক অবসরে লেখক আমাদের জানিয়েছেন- ‘সন্ধায় ফলমূল, সন্দেশ, দুধ, দই, নানা উপচারে ও ফুল, ধূপ, দীপ নানা আয়োজনে পরমভক্তির সহিত তাহারা লক্ষ্মীপূজা করিল। পূজাশেষে প্রৌঢ়াকে কেন্দ্র করিয়া এক-একটি সুপারি হাতে ব্রত-কথা শুনিতে বসিল।’

পরকীয়া এবং অবাধ যৌনাচার যে কারও জন্য সুফল বয়ে আনে না, তা বোঝানোর চেষ্টা আছে উপন্যাসে। নিতাই ঠাকুরঝিকে পায়নি; বসন্তকে পেয়েও হারিয়েছে চিরতরে। ঠাকুরঝি নিতাইকে ভালোবেসে হারিয়েছে সংসার, ইহকাল; যন্ত্রণা আর বিরহে মরতে হয়েছে তাকে। বসন্ত অবাধ যৌনজীবনের ফলস্বরূপ লাভ করেছে অপ্রতিরোধ্য রোগ আর শেষত মৃত্যু। বসন্তের পরিণতি বিষয়ে লেখক বলছেন তার বক্তব্য: ‘ইহাদের জীবনের এই একটা অধ্যায়। এ অধ্যায় অনিবার্য, আসিবেই। শুধু অনিবার্যই নয়, এই ব্যাধিতে জর্জরিত হইয়াই সমস্ত জীবনটা কাটাইতে হয় ইহাদের। এই জর্জরতার বিষই মানুষের মধ্যে ছড়াইতে ছড়াইতে তাহারা পথ চলে। ডাক্তারও দেখায় না, কবিরাজও না। নিজেরাই চিকিৎসা করে। ধরা-বাঁধা হাতুড়ে চিকিৎসা। চিকিৎসা অর্থে- ব্যাধিটা বাহ্যিক অন্তর্হিত হয়; কিন্তু রক্তস্রোতের মধ্যে প্রবাহিত হইয়া ফেরে।’ মানবজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের উপলব্ধিও আমরা পাই উপন্যাসটিতে। বসন্ত যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন লেখক পরিবেশন করেছেন মানুষের প্রকৃতিলগ্নতার বাস্তব-পরিপ্রেক্ষিত। লিখছেন: ‘রাত্রির শেষ প্রহর অদ্ভুত কাল। এই সময় দিনের সঞ্চিত উত্তাপ নিঃশেষে ক্ষয়িত হইয়া আসে, এবং সমস্ত উষ্ণতাকে চাপা দিয়া একটা রহস্যময় ঘন শীতলতা ধীরে ধীরে জাগিয়া ওঠে। সেই স্পর্শ ললাটে আসিয়া লাগে, চেতনা যেন অভিভূত হইয়া পড়ে। ধীরসঞ্চারিত নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়া একটা হিমরহস্য সমস্ত সৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, নিস্তরঙ্গ বায়ুস্তরের মধ্যে নিঃশব্দ সঞ্চারিত ধূমপুঞ্জের মতো। মাটির বুকের মধ্যে, গাছের পাতায় থাকিয়া যে অসংখ্য কোটি কীটপতঙ্গ অবিরাম ধক্ষনি তুলিয়া থাকে, তাহারা পর্যন্ত অভিভূত ও আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে রাত্রির এই শেষ প্রহরে।’

জাতবিচার এবং বিষয়-সম্পত্তির প্রতি মানুষের মোহ চিরন্তন। বসন্তের মৃত্যু-ঘটনার মধ্য দিয়ে সে সত্য পাঠক উপলব্ধি করতে পেরেছে। তার দলের লোকেরা পর্যন্ত জাতপাতের দোহাই দিয়েছে- মৃতদেহ সৎকারের কাজে যোগ না দেবার অজুহাত তৈরি করার জন্য। প্রায় সারাটা জীবন যাদের গড়িয়েছে পাপাচারে, তাদেরও পরকালের চিন্তা গ্রাস করেছে যেন। এ এক অপার রহস্য! কী অদ্ভুত মানুষের জীবন! আর আরেক বাস্তবতা এরকম- ‘বসন্ত আজই মরিয়াছে, দুপুরবেলা পর্যন্ত দেহটাও তাহার ছিল। এখন প্রায় সন্ধ্যা হইয়াছে, ইহারই মধ্যে দল হইতে বসন্ত মুছিয়া গেল! তাহার স্থান কে লইবে সেই সমস্যা এখনই পূরণ না করিলেই নয়।’ এই হল মানবজীবন, তারাশঙ্কর বোধকরি বলতে চেয়েছেন, পৃথিবীতে কেউই অনিবার্য নয়; কারও জন্য জগতের কোনো কাজ থেমে থাকে না। আর শূন্যস্থান পূরণের প্রয়োজনীয়তাও অবাস্তব নয়। এভাবেই সভ্যতা-সংস্কৃতি এগিয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। জীবন যে সত্যি খুব ছোট; এক জীবনে আমাদের সব আশা যে পূরণ হওয়া সম্ভব নয়-এ সত্য প্রকাশ হয়েছে নিতাইয়ের একটি গানে। নিতাই জানে বসন্তকে ভালোবেসেও তার সুখ হবে না। ঠাকুরঝিকে ভালোবেসে জীবনের লীলাটা অসমাপ্ত রেখে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসে পড়েছে বসন্তের মোহে। এই সামান্য কয়দিনের জীবনে বসন্তকে ভালোবাসিয়াই কি ভালোবাসার শেষ করতে পারবে; পারবে না।

কবি’র প্রধান চরিত্র নিতাইচরণ। চোর-ডাকাত বংশের ছেলে সে; খুনির দৌহিত্র, ডাকাতের ভাগিনেয়, ঠ্যাঙাড়ের পৌত্র, সিঁধেল চোরের পুত্র। গ্রামের অশিক্ষিত লোকেরা তাকে নেতাই বলে ডাকে; ঝুমুর দলের বসন্ত, পরবর্তীকালে নিতাইয়ের স্ত্রী বলে কয়লা-মানিক, দলের অন্য নারী নির্মলা-ললিতা তার নাম দিয়েছে বসন্তের কোকিল, আর গানের জন্য চারদিকে নাম রটেছে কালো কোকিল। তার দেহ কঠিন, পেশি সবল, রঙ রাত্রির অন্ধকারের মতো কালো, চোখের দৃষ্টি বিনীত। পরিবারের পেশায় তার মন নেই; স্বাভাবিক-স্বচ্ছন্দ জীবন চায় সে। শোনা যাক এ প্রসঙ্গে তারই জবানবন্দি: ‘আজ্ঞে প্রভু, চুরি জীবনে আমি করি নাই! মিছে কথাও আমি বলি না হুজুর, নেশা পর্যন্ত আমি করি না। জাত-জ্ঞাত মা ভাইয়ের সঙ্গেও এইজন্যে বনে না আমার। ঘর তো ঘর, আমি পাড়া পর্যন্ত ত্যাজ্য করেছি একরকম। আমি। থাকি ইস্টিশানে রাজন পয়েন্টস্ম্যানের কাছে। কুলিগিরি করে খাই।’

নিতাই জীবনের পোড়-খাওয়া মানুষ; ভালোবাসতে গিয়ে, নিজেকে পরিচিত নোংরা পরিবেশ থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে বারবার তাকে হোঁচট খেতে হয়েছে। ঠাকুরঝিকে ভালোবেসে পেয়েছে কষ্ট (ঠাকুরঝিও সাংসারিক সংকটে পড়েছে), বসন্তকে ভালোবেসেও পায়নি সুখ। সামাজিক কাঠামোর প্রতিকূলতা, অসামাজিক-অনিয়ন্ত্রিত জীবনের ভার বহন করতে করতে আজ যেন ক্লান্ত নিতাই। তাই সমাজ-আধুনিকতা-প্রগতিশীলতা সম্বন্ধে তার ভেতর জন্ম লাভ করে নতুন এক উপলব্ধি:

সামাজিক জীবনে মানুষের যাহা কিছু পাপ, যাহা কিছু কদর্য, যাহা কিছু উলঙ্গ অশীল তাহাই আবর্জনা-স্তূপের মত যেখানে জমা হয়, সেই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে তাহার জন্ম। দারিদ্র্য ও কঠিন দাসত্বের অনুশাসনের গণ্ডির ভিতর বহু যুগ যাহারা বাস করিয়া আসিতেছে, সে তাহাদেরই সন্তান। মা সেখানে অশীল গালিগালাজে শাসন করে; উচ্ছ্বসিত স্নেহে অশীল কথায় আদর করে, সন্তানকে সকৌতুকে অশীলতা শিক্ষা দেয়। অশীলতা, কদর্য ভাষা, ভাব নিতাইয়ের অজানা নয়। কিন্তু জীবনে সামান্য শিক্ষা এবং কবিয়ালির চর্চা করিয়া সে-সব সে এতদিন ভুলিতে চাহিয়াছিল। সে-সবের ওপর একটা অরুচি, একটা ঘৃণা তাহার জšি§য়াছিল।

কিন্তু ঝুমুর দলের বসন্ত এবং তাহাদের দর্শক-শ্রোতার রুচি ও চাহিদার কাছে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। আগের সে অবস্থান থেকে দূরে সরে আবার নোংরা জগতে প্রবেশ করে।

নিতাই পাহাড়ের ওপারের অদৃশ্য গ্রামের মতো মৃত্যুর পরপারের জগৎকে অনুভব করেছে প্রিয়মুখগুলোর বিদায়বারতার ভেতর দিয়ে। অবশেষে সে বৈরাগ্য-সাধনে মুক্তির পথ খুঁজেছে। মানবসন্তান যে প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর পথিক-পরিব্রাজক মাত্র; পথই যে তার একমাত্র ঠিকানা- এ সত্যে উপনীত হতে পেরেছে কবিয়াল ও প্রেমিকপুরুষ নিতাই। পথে পথে খুঁজেছে সে সত্যিকারের বিশ্বনাথের কাশি; পবিত্রভূমি- দোকানদারিভরা বিকিকিনির কোলাহলমুখর নগরী নয়। সে খুঁজে ফিরেছে সেই চিরায়ত গ্রাম; আপন ঠিকানা- যেখানে আছে প্রকৃত ধর্মানুভূতি, আছে গাছগাছালির সারি, নদীর প্রবাহ, সজনের সতেজ ডাঁটা, মায়ের স্নেহমাখা আহ্বান; যেখানে এখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে জীবনের অনাদি শান্তি উদার।

অত্যন্ত সাদাসিধা মেয়ে ঠাকুরঝির মনে লেগেছিল নিতাইকে। তার সঙ্গে কথা বলতে, তার গান শুনতে মনে মনে অধীর অপেক্ষায় থাকতো মেয়েটি। নিজের মানুষের মতো মন খুলে বলতো সব কথা। সংসারের, ঘরের সমস্ত বৃত্তান্ত যেন নিতাইকে জানাতে পারলেই তার সুখ; ‘সংসারের তুচ্ছতম সংবাদটি পর্যন্ত ঠাকুরঝি তাহাকে বলিয়াছে। দেওয়ালে কোথায় একটি সুচ গাঁথা আছে, নিতাই সেটি গিয়া স্বচ্ছন্দে- চোখ বন্ধ করিয়া লইয়া আসিতে পারে।’ নিয়তির নির্মম কষাঘাতে, নিতাইকে ভালোবাসার দায়ে- বিরহ যাতনায় পাগলপ্রায় হয়ে তাকে মরতে হয়েছে। ঝুমুর দলের মেয়ে বসন্ত; দীর্ঘ কৃশতনু গৌরাঙ্গী। অদ্ভুত দুটি চোখ খুব চঞ্চল। কথাবার্তায় চটুল। চায়ের প্রতি খুব নেশা। অল্প সময়ে, সহজে মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা তার আছে। নিতাইয়ের সঙ্গে ভাব করতেও তার দেরি হয় না। কৌতুক করে সে তার নাম দেয় ‘কয়লা-মানিক’; নিতাইয়ের গায়ের কালো রঙকে এভাবেই স্বাগত জানায় বসন্ত। বসন্তসহ দলের অন্য মেয়েরা রূপ-পসারিণী; দেহব্যবসায় তাদের একরকম অহংকার আছে, অবশ্য কোনো মর্যাদা নেই। লেখক সম্ভবত আমাদের মনে করিয়ে দিতে চান, জীবনের জন্য, জীবিকার জন্য পাপাচারে লিপ্ত হলেও মানুষ তার অলংকার- লজ্জা আর প্রাপ্য আনন্দটুকু উপভোগ করতে চায়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি খুব অভিমানী এই বসন্ত; মৃত্যুর দ্বারে যখন সে উপস্থিত, তখন নিতাই তাকে ভগবানের নাম নিতে বললে সে নিরাবেগকণ্ঠে জানায়- ‘না। কি দিয়েছে ভগবান আমাকে? স্বামীপুত্র ঘরসংসার কি দিয়েছে?’

উপন্যাসের শেষে তারাশঙ্কর পাঠককে জানিয়েছেন জীবন সম্বন্ধে এক অমিত অনুভবের কথা; মানবমনে ভাব-উদ্রেককারী চিন্তার কথা। তার সেই চিরন্তন বাণী আজও আমাদের- বাঙালি পাঠককে অজানা কোনো ভাবনার ভুবনে নিয়ে যায়; পাঠকের জন্য লেখকের উপলব্ধিটি উদ্ধৃত করছি: ‘এই খেদ আমার মনে-/ ভালোবেসে মিটলো না এ সাধ, কুলালো না এ জীবনে।/ হায়- জীবন এতো ছোট কেন?/ এ ভুবনে?’

Logo


© ২০১২ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

BTL Ltd

ফোনঃ ৯৫৭১৬২৫

সম্পাদক:
যোগাযোগ: ৫১/৫১ এ রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১০ম তলা), ঢাকা
ই-মেইলঃ news@somoy24.com,
toprealnews24@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি