১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১:৫৫ অপরাহ্ন

সবার আগে কোরবানি দিই মনের পশুবৃত্তিকে ।। হাসি ইকবাল

সবার আগে কোরবানি দিই মনের পশুবৃত্তিকে ।। হাসি ইকবাল

ঈদুল আযহা ইসলাম ধর্মাবালম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দু’টি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে একটি । বাংলাদেশে এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ কিংবা বকরা ঈদ নামেও পরিচিত । আরবি ঈদ শব্দের অর্থ ফিরে আসা , বার বার আসা । আর আজহার শাব্দিক অর্থ রক্ত প্রবাহিত করা । এর আরেক অর্থ ত্যাগ- তিতিক্ষা । কোরবানি আরবি শব্দ এর অর্থ হলো নিকটবর্তী হওয়া , নৈকট্য লাভ করা । সবক’টি শব্দের একসঙ্গে অর্থ দাড়ালো প্রানপ্রিয় বস্তুকে আল্লাহর কাছে উৎসর্গ করার লক্ষ্যে রক্ত প্রবাহিত করে আল্লাহর সন্তÍষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় যে দিবস বারবার আমাদের মাঝে খুশি ও আনন্দ দিতে আসে তা- ই ঈদুল আজহা বা কোরবানীর ঈদ । কোরবানি শব্দের অর্থ হলো আত্মত্যাগ , আত্মোৎসর্গ , নৈকট্য অর্জন ইত্যাদি ।

শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয় জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১৩ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা । সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর আদেশে হযরত ইব্রাহিম ( আঃ ) তার প্রানপ্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানি করার ঘটনাকে স্বরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এই দিবসটি পালন করে পশু কোরবানি দিয়ে থাকে । এ এক অনাবিল আনন্দ । এ আনন্দ আল্লাহর নৈকট্য লাভের আনন্দ । এ আনন্দ পশু কোরবানীর সাথে সাথে মনের পশুকে পরাস্থ করার আনন্দ ।

প্রতি বৎসর ঈদ আসে সত্য ও সুন্দরের জয়গান নিয়ে । ঈদুল আজহার পবিত্র দিনে পশু কোরবানি দিয়ে মানব মনের সমস্ত পশু প্রবৃত্তির মূলোৎপটন এবং আত্মশুদ্ধি ও মানবিক কল্যাণ চেতনাকে শানিত করার এটি একটি জলন্ত শিক্ষা । ঈদুল আজহার মৌলিক শিক্ষা হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি ও খোদাপ্রীতি । শুধু কোরবানি নয় বরং নিজেদের মধ্যে যত পশুত্ব ,পাশবিকতা ও কুপ্রবৃত্তি আছে সেগুলোকে হত্যা করে প্রয়োজনে প্রাণাধিক প্রিয়বস্তুকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করাই হচ্ছে কোরবানির ঈদ । প্রতিবছর কোরবানি এলে পশুর রক্তের বন্যা বয়ে যায় । গরীবেরা ঈদ উৎসব পালন করে বাজারের উত্তাপ সহ্য করেই । আর ব্যবসায়ীরা দাঁত কেলিয়ে হাসেন বাড়তি আয়ের আনন্দে । সারা বছর ধর্মেকর্মে মতি না থাকলেও বাজারে কে কত দামে গরু কিনছেন , কার গরু কতটা স্বাস্থ্যবান এই নিয়ে চলে প্রতিযোগীতা । এখনকার ডিজিটাল যুগে সেই গরুর সাথে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া কিংবা পত্রপত্রিকায় কত দামী গরু / উট এসেছে হাটে সে ছবি না দিলে যেন মন ভরতে চায়না কিছুতেই ।

আধুনিকতা ও লৌকিকতার মাঝে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ ও মহিমা । কালের গড্ডালিক প্রবাহে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা । যে আনন্দের বারতা নিয়ে মুসলামানদের কাছে ঈদ আসে প্রতিবছর তার অন্তরালে যেন ডুকরে কাঁদে ঈদের প্রকৃত শান্তি , প্রকৃত বানী। মনের পশুকে জবেহ করার পরিবর্তে আমরা হয়ে উঠি পশু হন্তারক । মানুষে মানুষে হানাহানি , খুনাখুনি তাই লেগেই আছে । হিংসা , প্রতিহিংসা , লুট , আহাজারি , দখলদারিত্বের মারমার কাটকাট যুদ্ধ। চাঁদা , দালালি , চুরি , জবরদখলের দৃশ্য এখন হাটগুলিতে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার । । পাশাপাশি কোরবানি জবাই নিয়েও চলে নগ্ন প্রতিযোগীতা । একই আচরন থেকে বাদ যায়না কোরবানীর মাংস বিতরনেও । দামী গরুর মাংস বিতরন যেমন তেমন মাসের পর মাস কিভাবে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষন করে নিজেরা ভক্ষন করতে পারবেন অনেকের নজর সেদিকে । কেউবা গরীব দুঃখিদের বিতরনের চেয়ে বড়লোক আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদেরকেই বিলাতে পছন্দ করেন বেশী । আবার কোরবানির চামড়া নিয়েও চলে স্বার্থবাদী বানিজ্য । ন্যায্য মূল্য না দিইে টেনে হেচড়ে ছিনিয়ে নেয়া হয় এতিম , দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত কোরবানির চামড়া ।

মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন আজ সর্বত্র , তাইতো সমাজের প্রতিটা রন্ধে রন্ধে ঢুকে গেছে অপরাধ , হানাহানি আর খুনাখুনির চিত্র । অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরা যেন সেই আদিমতার যুগে আবারো ফিরে যাচ্ছি । অশান্তি আর প্রতিহিংসার প্রচন্তডায় দদ্ধ আজ সমগ্র মানবজাতী । মনের নোংরামিতে ভেসে গেছে গোটা বিশ্ব । কে কাকে টপকে উপরে যাবে চলছে সেই প্রতিযোগীতা । এটা ইসলামের শিক্ষা নয় । ঈদের মূল লক্ষ্য নয় । ঈদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ত্যাগ । তাই আসুন ভোগে নয় ত্যাগের মহিমা কীর্ত্তণের মাধম্যে সবার আগে নিজের মনের পশু বৃত্তিটাকে কোরবানি করে শুদ্ধ মানুষ হয়ে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করি । তবেই মনের নোংরামি ভেসে যাবে আত্মশুদ্ধির ডানায় ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Logo


© ২০১২ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

BTL Ltd

ফোনঃ ৯৫৭১৬২৫

সম্পাদক:
যোগাযোগ: ৫১/৫১ এ রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১০ম তলা), ঢাকা
ই-মেইলঃ news@somoy24.com,
toprealnews24@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি