আমিই অপরাজিতা
তাসলিমা রুবি
অবশেষে অপরাজিতা অপরাজিতাই থেকে গেল।জন্মেই বৈষম্য যাকে স্নেহ বঞ্চিত করেছে,তার জীবন ফুলের বিছানা হবে না সেটাই তো স্বাভাবিক।জন্মেই শিশু কেঁদে উঠবে এটাই ঘটমান।কিন্তু যার মুখটি দেখে প্রত্যাশা পূর্ণতা না পেয়ে সবাই যখন গোমরা মুখো,সবাইকে অবাক করে তখন হেসে ওঠে অপরাজিতা।আর সেই নিষ্পাপ,নির্মল হাসি দেখে আর কার কি হয়েছিল জানা হয় নি।তবে বাবার বুকটি ভরে ওঠে,বাবা স্বস্নেহে কোলে তুলে নেয় শিশুটিকে।ছোট্ট শিশুটি সেদিন তার হাসির যাদুতে জিতে নিয়েছিল বাবার হৃদয়।
তারপর দিন কেটেছে আর দিনে দিনে শুধুই বেড়েছে বাবার বিস্ময়।আর সব শিশুর মতো অপরাজিতা কাঁদে না,কেবল বিস্ময়ে ডাগর আঁখি মেলে দেখে পৃথিবীর রূপ আর বৈষম্য।ক্ষুধায় কাতর হলেও নাকি সে কাঁদেনি,শুধু ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখতো এক টুকরো মায়াবী হাসি।দিন গেছে,বছর গেছে বাবার হাতটি ধরে,বাবার উদার দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীকে এঁকেছে।বাবা নামক বটবৃক্ষ তাকে যেমন শিখিয়েছে,তেমনি প্রতিদান দিয়েছে বাবাকে।বাবা ভরসা করে পরিবারের ভাল -মন্দ সিদ্ধান্তের ভার দিতেন।অত্যন্ত সরলতার সাথে ছোট্ট কিশোরী মেয়েটি যে মতামত দিত তাই সকলকে মেনে নিতে হতো।বাবার উচ্ছ্বাস দেখে গর্বে ভরে যেত অপরাজিতার বুক।যে মেয়েটিকে কালো বলে সবাই তাচ্ছিল্য করতো বাবা তার হাতে তুলে দিতো সব ক্ষমতা।জমিতে প্রথম মুষ্টিভরে বীজ বপন করা,নতুন বাড়ির প্রথম ইট যার হাতে, বিশাল অংকের টাকার লেনদেন সব কিছু অতি উৎসাহে বাবা তুলে দিয়েছে অপরাজিতার ছোট্ট হাতে।বাবার অতি স্নেহের কারণে বাবার অনুপস্থিতে বহুবার বিপদে ফেলেছে পরিবারের অন্য সদস্যরা।বাবার কাছে তার ইমেজ নষ্ট করার জন্য করেছে কতো ষড়যন্ত্র।কিন্তু বাবা সবার সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করতো অপরাজিতাকে, নত মুখে যখন জানাতো না, তখন ষড়যন্ত্রকারীদের উল্টো শাস্তি পেতে হয়েছে।হঠাৎ একদিন কালবৈশাখীর তুমুল তাণ্ডব উপড়ে দিয়ে গেল সমূলে বটবৃক্ষটাকে।ভেসে গেল সব স্বপ্ন,বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে গেল অপরাজিতার।পৃথিবীর সব বাতাস বয়ে আনল বৈরিতা।এমন কি নিজের কৃষ্ণকায় শরীর ও হয়ে উঠল আষাঢ়ের ভরা নদী,আগের কৃষ্ণ রংটি মিলে গেল হঠাৎই,জোয়ারের মতো হলুদসোনা রং ভর করলো শরীরে।আর সব শত্রুর চেয়েও বড় শত্রু হয়ে দেখা দিল তার যৌবনদীপ্ত শরীর।লোভাতুর শকুনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফালা ফালা করে অপরাজিতাকে।তবু সেই দূর্দিনে বাবার মুখটি মনে করে বার বার ঘুরে দাঁড়িয়েছে অপরাজিতা।মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা আক্রমণ রুখে দিয়েছে।ক্লান্ত,অবসন্ন হয়ে ম্লান হয়েছে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।হারিয়ে গেছে জীবন থেকে অনেকগুলো বছর।দু চোখে একরাশ স্বপ্ন আর মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় অপরাজিতা।কখনো বৈরী স্রোত ভাসিয়ে নিলেও, ফিরেছে স্বকীয়তায়।স্রোতের উজানে চলতে চলতে এখন সেটাই হয়েছে তার আসল পথ।হেমলক শিশি ঘৃণায় উঠেছে হাতে,হৃদয় ভাঙ্গা যন্ত্রণায় অবজ্ঞার ফাঁসির দড়ি উঠেছে গলায়,তবু জীবন ভালবাসা অপরাজিতা ঠিক দাঁড়িয়েছে ঘুরে।মৃত্যু ,জড়া, সব লজ্জিত হয়ে ফিরে গেছে অপরাজিতার দুয়ার থেকে।অবশেষে অপরাজিতা এসে গেছে সঠিক বন্দরের কাছে।বন্দর অপ্রস্তুত তাকে স্বাগত জানাতে।তাই আজ আর নিজেকে আড়াল করার সুযোগ রইল না অপরাজিতার।ফিরে গেল আপন পরিচয়ে।যেখানেই থাকো,ভালো থাকো বাংলার নারী,ভালো থেকো অপরাজিতা –

Leave a Reply

  • (not be published)