ঈদে তাহসানকে যেমন দেখলাম
।। আকিব অভীর ।।

শুভ সময় সবাইকে। শেষ ৫/৬ বছর ধরে ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থেকে এসেছে তাহসানের নাটক। শুধু দু’ঈদই নয়, বাংলা নাটকের মহা-উৎসব হিসেবে বিবেচিত বছরের ভ্যালেন্টাইন ও পহেলা বৈশাখের টিভি আয়োজন তাহসানহীন যেন ভাবাই যায় না। তাই এই ঈদেও তার ব্যতিক্রম হবে না সেটাই স্বাভাবিক।
tahsanতবে এবারের ঈদটা তাহসানিয়ানদের জন্য ছিল একটু বেশিই স্পেশাল। কেন নয়? এবার যে তাহসানের রেকর্ড সংখ্যক নাটক প্রচার পেয়েছে।
এর আগে তাহসানের এক ফেস্টিভালে রেকর্ড ছিল যত দূর মনে পড়ে ৪টি। আর এই ঈদে তা দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণে, অর্থাৎ ৮টি।
সুতরাং তাহসানিয়ানরা এই ঈদের ৫ দিনই কাটিয়েছে উৎসব মুখর আমেজে।5223b74b9d216-Untitled-8

তাহসানের এতগুলো নাটকের মধ্যে কিছু কিছু নাটক ছিল একেবারে মানহীন। তাই অনেকে ভ্রু কুচকে বলেছেন, “এত নাটক করার কি দরকার ছিল? বেছে বেছে করলেই পারত। অযথা কোয়ালিটি খারাপ হচ্ছে”।
আমি কথাটার সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারছি না। এখানে আমার কিছু যুক্তিও আছে।

যুক্তি-১: সব কিছুতে যেমন নেগেটিভ ফ্যাক্ট থাকে, তার পাশাপাশি থাকে কিছু পজিটিভ ফ্যাক্টও। এখানে আমি পজিটিভটাকে ধরেই বলতে চাই। প্রতি বার তাহসান হয়ত ২/৩টা নাটক করে, যার সিংহভাগই হিট হয়। কিন্তু এবার তাহসানের পর পর এতগুলো নাটক দেখে আমরা তার অভিনয়শৈলী সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারনা পেয়েছি। সে যে কেমন ভার্সাটাইল একজন অভিনেতা তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকল না। সুতরাং তাহসানের নিজের অভিনয় গুনকে আরও বিকশিত করতে এতগুলো কাজ তাকে অনেক সহায়তা করেছে বলেই আমার বিশ্বাস।

যুক্তি-২: তাহসানকে আর নতুন করে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই। তিনি যে একজন উচ্চমানের অভিনেতা তা ইতোমধ্যে তিনি প্রমাণ করেছেন। সুতরাং নাটক হিট হবে কি হবে না এই ভয় থেকে তিনি নিজেকে দাবিয়ে রাখবেন ঐ দিন এখন আর নেই। এখন তিনি অভিনয়ের সাথে এক্সপেরিমেন্ট করতেই পারেন।tahsan-mehjabin

সূতরাং নাটক সংখ্যা অধিক হওয়াতে আমি কোনো দোষ খুঁজি না। তবে হ্যাঁ, তাহসান যেন এখান থেকে শিক্ষা নেন যে আগামীতে কি ধরনের স্ক্রিপ্ট তিনি একসেপ্ট করবেন সেটাই কামনা করি।

এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। আমার কাছের বন্ধুরা অনেকেই জানে যে আমি যেমন তাহসানের পাগল ভক্ত, ঠিক তেমনটাই হৃদয় খান ও হাবিবের বিশাল ভক্ত। তো এই ঈদে প্রথম বারের মত নাটকে অভিনয় করেছেন হৃদয় খান। তাই ঈদের আগে থেকে বড় এক্সাইটেড ছিলাম তার নাটকগুলো দেখার জন্য।
tahsan-tishaতবে একজন নিরপেক্ষ এবং খাটি ভক্ত হিসেবে আমি বলব, এটা হৃদয়ের জায়গা না। আশা করব আগামীতে উনি এখানে আর চেষ্টা করবেন না।
ডেব্যুট অভিনয়ে অনেকেই অপরিণত অভিনয় করেন। কিন্তু ভবিষ্যতে কারা নিজের অভিনয়কে উন্নত করতে পারবেন তা প্রথম কাজ দেখেই বলে দেয়া যায়। কিন্তু আমার মনে হয় না হৃদয়ের আবার এই চেষ্টাটা করা উচিত। কারণ অভিনয়ের সাথে তার দুর-দূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই। মিউজিক ভিডিওর একটিং আর একটা পুরো এক ঘণ্টার নাটকের এক্টিং এক কথা নয়। হৃদয়ের ডায়লগ ডেলিভারি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চেহারার এক্সপ্রেশন কোনো কিছুই অভিনয়ের সাথে যায় না। সুতরাং একজন খাটি ভক্ত হিসেবে বলব উনি চেষ্টা করেছেন সেটার জন্য সাধুবাদ, তবে এটা তার জন্য নয়।

আবার তাহসানে ফেরত আসি,
এবার তাহসানের ৮টি নাটকে একটিতেও তিশার সাথে জুটিবদ্ধ নেই। সুতরাং তাহসান-তিশার ক্যামিস্ট্রিটা আমার মত অনেকে মিস করেছেন নিশ্চয়ই। তবে মিথিলা মীম ও মম’র সাথে বরাবরের মত রসায়নটা জমেছে বেশ। এবার আমি আমার পছন্দের ৮টি কাউন্টডাউন লিখছি। ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এই লিস্টটি তৈরি করা।

৮। ক’তে কাজী খ’তে খেলাঃ
সত্যি বলতে এই নাটকটা ভালো মত দেখাই হয়নি। ঐদিন একই সময় দুটো নাটক পড়ে যাওয়াতে একটাতেও মন বসাতে পারিনি। তবে যেহেতু এই নাটকটা আমার বলতে গেলে দেখাই হয়নি, তাই এ নিয়ে কিছু বলছি না। তবে যতটুকুই দেখেছি, কেন যেন বাকিটুকু দেখার তেমন আগ্রহ পাচ্ছি না।

৭। সেই রাতে বৃষ্টি ছিলঃ
আমার দেখা তাহসানের জঘন্যতম নাটকের মধ্যে এটি একটি। প্রথমত যে ভদ্র মহিলাটিকে (রিচি সোলায়মান) তাহসানের বিপরীতে দিয়েছে তাকে তাহসানের বৌ কম, বড় বোন বেশি দেখায়। পরিচালক সাহেব কোন আক্কেলে এই জুটিকে ভাবতে পেরেছেন তা আমি জানি না। যাইহোক, গল্পও ভালো লাগেনি। খুব দুর্বল একটা নাটক ছিল।

৬। প্রেম কেবলই একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া:
এই নাটকটা যদি খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করি তাহলে অনেক ছোট ছোট ভুল এতে আছে। প্রথমত, তাহসান যদি মিথিলাকে ভালোই বাসত তাহলে কেনই বা তার বন্ধুকে বাজাল? আর যখন মিথিলা সবার সামনে তাকে লাভার পরিচয় দিল তাতে এত জ্বলে ওঠার কারণ কি? মানে সব সময় সব নাটকে এই ধরনের ট্রিক যায় না। পরিচালক সাহেব অযথাই নাটকটিকে টেনেছেন। তাও মেনে নিতাম যদি এই বর্ধিত গল্পে কোনো ইন্টারেস্টিং কিছু থাকত। অথচ পুরোটাই ছিল “বোরিং”। গল্পটা অনেকে কাল হো না হো ছবির সাথে মিলিয়ে প্রিডিক্ট করবেন। সেটাও যদি শেষ এন্ডিংটা হত তাও গল্পটি বর্ধিত করার একটা লজিক থাকত। কিন্তু সেটাও না, অর্থাত্‍ অযথাই সময় নষ্ট। আরেকটা ছোট্ট ভুল হল, নাটকের একটা জায়গায় দেখানো হয়েছে যে তাহসান গাড়ি চালাচ্ছে এবং তখনই দেখালো যে “দুই দিন পর”। মজার ব্যাপার হল দুই দিন পরের দৃশ্যেও তাহসান একই জায়গায় একই ভাবে একই ড্রেসআপে গাড়ি চালাচ্ছে। এটা হতে পারে পরিচালক সাহেব ছোট্ট আরেকটা সংলাপহীন দৃশ্য শুট করতে আলাদা টাকা খরচ করতে চাননি। তবে এসব ভুল বেশ চোখে পড়ে।
নাটকের ক্লাইম্যাক্সটাও একদমই সাধারণ। এত কাহিনীর পর অন্তত আমি একটু আলাদা কিছু আশা করেছিলাম। তবে তাহসান যখন মিথিলাকে প্রেমের রাসায়নিক বিক্রিয়াটি বুঝায় ঐ এক্টিংটা অসাধারণ লেগেছে। তাহসানের কমিক সেন্স ভালো। কমিক ডায়লগ দেয়ার সময় তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বেশ চমৎকার।

৫। তিতির:70e38871af447a9d4368feaf1901c8ec-570a1e625b373
এই আরেকটা নাটক যেটা প্রথম দিক দিয়ে বেশ ভালই লেগেছে। কিন্তু শেষের দিকে এসে বোরিং হয়ে গেছে। তবে উপরে লিখেছি, এতগুলো নাটকের মধ্যে তাহসানের অভিনয়ের ভার্সাটালিটি দেখতে পেয়েছি। এই নাটকে তাহসান চমৎকার অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তির অভিনয়টা ছিল অসাধারণ। তাহসান আর উর্মিলার ক্যামিস্ট্রি ঠিকঠাক ছিল।

৪। অনামিকা:
ব্যক্তিগতভাবে এই নাটকটা আমার খুবই ভালো লেগেছে। এখানে আমি এক নতুন তাহসানকে আবিস্কার করেছি। তার গেটআপ, লুক, এক্টিং, একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে তার হাটা চলা এক কথায় আমি নতুন করে তাহসানের ফ্যান হয়ে গেছি। নাটকের প্লটটাও বেশ ইন্টারেস্টিং। পেন ফ্রেন্ডের উপর আমি কোনো বাংলা নাটক এ পর্যন্ত দেখিনি।
তবে এখানে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে। দেখা করার পর থেকে নাটকের গতি অনেক অনেক মন্থর হয়ে যায়। অর্থাৎ এতো স্লো ভাবে গল্প আগায়, মাঝ খানে অন্তত ৪/৫ মিনিট শুধু হাঁটাহাঁটি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে ভরা। আমার তো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মুখস্থই হয়ে গেছিল। ঈদের নাটক এত স্লো হলে চলে না।
তবে ওভারঅল নাটকটা খারাপ লাগেনি।

৩। রূপকথা এখন আর হয় না:
আমার মতে শুধু এই ঈদ না, এ যাবত কালের তাহসান তার সেরা অভিনয়টা দিয়েছেন এই নাটকে। আমি কেবল তাকিয়ে ছিলাম এই লোকটার অভিনয়ে। আমার এখন এই কথাটা বলতে তীব্র আপত্তি যে তাহসান পেশাগত অভিনেতা নন। মম’র প্রতি তার ভালোবাসার প্রকাশ, প্রত্যাখ্যাত হয়ে বার বার তার কাছে আকুল আবেদন করা প্রতিটা দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানে মম’র অভিনয়ের কথাও উল্লেখ না করলেই নয়। তবে সে যেহেতু পেশাগত অভিনেত্রী তাই তার কাছ থেকে এটাই কাম্য ছিল। কিন্তু তাহসানকে দেখে আমি জাস্ট ভাষা হারিয়ে ফেলেছি কি লিখব।
নাটকের ক্লাইম্যাক্স আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। বাস্তব সম্মত ক্লাইম্যাক্স, কোনো ড্রামা না কোনো রূপকথা না কিচ্ছু না। শিরোনামের সাথে মিল রেখেই নাটকের এন্ডিংটা হয়েছে।
আর এই নাটকে তাহসান “একবার যদি কেউ” গানটি কভার করেছেন, সেটাও ভালো লেগেছে।

২। সেই মেয়েটা:3_21
আপনার যদি নীলপরি নীলাঞ্জনা, এংরি বার্ড, মন ফড়িঙয়ের গল্প নাটকগুলো ভালো লেগে থাকে তাহলে এটা আপনার জন্য। এক কথায় এটা “তাহসান টাইপ” নাটক। এই নাটকের সেট দেখেই মনে হয় নাটকটা বেশ চড়া বাজেটে তৈরি। খুব যত্ন সহকারে চিত্রনাট্য লিখা হয়েছে। ছোট ছোট জায়গাগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং করে তোলা হয়েছে। নাটকে একটা সাসপেন্স আছে, সেটা যখন খোলাসা হয় আমি জাস্ট হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বেশ বড় একটা টুইস্ট পেয়েছি নাটকে।
তাহসান-মীমের অভিনয় নিয়ে আলাদা কিছু বললাম না। তবে এ বছরের ৮টা নাটকের মধ্যে এই নাটকের তাহসানের লুকটা ছিল বেস্ট। তার এরকম লুক আগে দেখিনি। আর এখানে বিশেষ উল্লেখ করতে চাই তাহসানের বন্ধু চরিত্রে অভিনয় করা মোটা সোটা লোকটাকে। লোকটাকে আমার ভালোই লাগে, যদিও নামটা আমি জানি না। কেঊ জানলে জানাবেন।

১। কথপোকথনঃtisha
তাহসানের সর্ব কালের সেরা নাটকের তালিকা করতে দিলে এই নাটকটা কোনোভাবেই বাদ পড়বে না। আমার মতে তাহসান আজ অবধি যতোগুলো মানসম্মত স্ক্রিপ্ট সাইন করেছে তার মধ্যে এটা একটা। নাটকের একটা ন্যানো সেকেন্ড নাই যেখানে আপনি পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারবেন। একটার পর একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এত চমৎকার নাটক বছরে ২/১টা হয়।
অপূর্বকে আমার বরাবরের মতই খুব ভালো লাগে। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল তাহসান আর অপূর্বকে একসাথে এক নাটকে দেখব। সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেল চমৎকার একটা নাটকের মাধ্যমে।
এই নাটকের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট কি জানেন? আপনি নাটকের প্রত্যেকটা চরিত্রের সাথে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে পারবেন। প্রত্যেকটা চরিত্রের অনুভূতি আপনি নিজে ফিল করতে পারবেন। আপনি এটা দেখে যেমন হাসবেন তেমনই কাঁদবেন। আমি তো বলব এর চেয়ে চমৎকার নাটক তাহসানের আমি আর দেখিনি।

তো এই ছিল তাহসানের এই ঈদের নাটকের উপর আমার ব্যক্তিগত এনালাইসিস। কারো পছন্দকে তুচ্ছ করার জন্য এই রিভিউ না। আমি শুধু নিজের অনুভূতিটা প্রকাশ করলাম।
ধন্যবাদ এত সময় নিয়ে পড়ার জন্য।

Leave a Reply

  • (not be published)