৩রা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ শনিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৮, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

জাফলংয়ে হাজার বছরের পুরনো রাজবাড়ীর সন্ধান…

সময় ডেস্ক ll সিলেটের জাফলংয়ের বল্লাপুঞ্জিতে হাজার বছরের পুরনো এক রাজবাড়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে। কথিত ‘মন্দিরের জুম’ নামে পরিচিত বাড়িটি খাসিয়াদের ঐতিহাসিক ‘মালনিয়াং রাজ্য’ এর রাজবাড়ী বলে গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা প্রাচীন এ রাজবাড়ীটি সম্প্রতি ‘সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সংস্থার একদল স্বেচ্ছাসেবী আবিষ্কার করেছেন।

‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ঘোষিত জাফলংয়ে পর্যটক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এটি নতুন মাত্রা যুক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাচীন এ রাজবাড়ীটি সংস্কার ও সংরক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এলাকাবাসী ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আন্দোলনের পক্ষ হতে জোর দাবি জানানো হয়েছে। সরজমিনে পরিদর্শনকালে জানা গেছে, খাসিয়াদের সবচেয়ে প্রাচীন ও গৌরবময় রাজ্যগুলোর অন্যতম হচ্ছে মালনিয়াং বা মাধুর মাস্কুট রাজ্য। সে রাজ্য নিয়ে খাসিয়ারা এখনও গর্ববোধ করেন। খাসিয়া মিথ ও কিংবদন্তীতে সে রাজ্যের অনেক উল্লেখ পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, তেরো শতাব্দীতে জৈন্তিয়া রাজা কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজ্যটিকে নিজের রাজ্যভুক্ত করেন। এ রাজ্যের পূর্বদিকে মণিপুর রাজ্য, উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ, পশ্চিমে ময়মনসিংহ এবং দক্ষিণে ঢাকা-ত্রিপুরা অবস্থিত ছিল। জৈন্তিয়াসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য বা সীয়েম সমূহ এ সাম্রাজ্যেরই অধীনে ছিল। রাজ্যটি এককালে সিলেট সদর ও শহর এলাকা, কোম্পানীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ জেলার কিয়দংশ, জায়ন্তিয়া পাহাড়ের কিয়দংশ এবং আসামের সমতলভূমি নিয়ে গঠিত ছিল। সিলেটের মালাগুল, মালনিছড়া, দলহরগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, ইয়াওফ্লাং (জাফলং), চিকনাগুল, শীলত (সিলেট) ইত্যাদি নামক স্থানগুলোর নাম এ রাজাদের সময়ে বা রাজাদের কর্তৃক নামকরণ করা হয়েছে বলে গবেষকরা দাবি করেছেন।

এ রাজ্যের রাজাগণ হচ্ছেন- নিয়াং রাজা, কল্লং রাজা, কন্দুর রাজা এবং মাইলং রাজা। মাইলং রাজাই এ রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন। গবেষক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.ফিল.ইতিহাসের গবেষক আবদুল হাই আল হাদী মানবজমিনকে জানান, খাসিয়া জাতির প্রাচীন ইতিহাস ও নথিপত্রে মালনিয়াং রাজ্য এবং সে রাজ্যের রাজধানী জাফলংযের বল্লাপুঞ্জির অদূরে (যাহা মন্দিরের জুম) রাজবাড়ীর অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু কোথাও এ বাড়ীর বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা বিবরণ পাওয়া যায়না। স্থানীয় লোকজনও প্রাচীন এ রাজবাড়ীর কথা পুরোপুরিই ভুলে গেছেন। যে দু’একজন এ বাড়ীটিকে চিনে, তাদের মধ্যেও এটা নিয়ে রয়েছে বিস্তর ভুল ধারণা। ব্যক্তিগত উৎসাহ এবং গবেষণার প্রয়োজনে দীর্ঘদিন অনুসন্ধানের পর এ রাজবাড়ীর অবস্থান এবং ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে। জাফলং এ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাসরত খাসিয়া প্রবীণদের সহযোগিতাও এ  রাজবাড়ীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করতে অনেক সাহায্য করেছে। জাফলং এর প্রাচীন খাসিয়া বসতি ‘বল্লাপুঞ্জি’র অদূরে  বন-বাদাড় ও পান-সুপারি’ জুমের (বাগানের) ভিতরে সেই রাজবাড়ীটির সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘মন্দিরের জুম’ নামে ব্যাপক পরিচিত। সে জুমটি পান-সুপারিসহ নানা রকম বৃক্ষে আচ্ছাদিত এবং কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত। পাথরখেকোদের লোলুপ দৃষ্টি ও লোভাতুর হাত থেকে রক্ষার জন্যই সম্ভবত জায়গার মালিকরা এমন ব্যবস্থা নিয়ে থাকতে পারেন। সরজমিন পরিদর্শনকালে সেই জুমের মধ্যে ঢুকে দেখা গেছে, হাজার বছরের পুরনো সে রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজও নিজের অতীতের গৌরবগাঁথা ধারণ করে আছে। বাড়ীটির পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের বিশাল দেয়ালটি এখনো অবিকৃতভাবে দণ্ডায়মানভাবে দাঁড়ানো রয়েছে।

রাজবাড়ীটিতে দু’দিকে রয়েছে প্রাচীন আমলের দুটি রাজকীয় গেট যা প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীরই পরিচয় বহন করছে।

দেয়ালের মধ্যে রয়েছে রাজবাড়ীর মূল ঘরটি; যদিও পুরো ঘরটি সম্পূর্ণভাবে দাঁড়ানো নেই। শুধুমাত্র দেয়ালের ভূমিসংলগ্ন অংশ প্রায় ২/৩ ফুটের মতো উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের দেয়ালের নীচের পাকা অংশ দেখে সহজেই সে ঘরের আয়তন সম্পর্কে জানা যায়। ঘরটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ গজ এবং প্রস্থে প্রায় ১০ ফুটের মতো হবে। উচ্চতা কেমন ছিল-তা বর্তমান সময়ে অনুমান করা সম্ভব নয়। তবে স্থপতিদের দ্বারা সেটা সম্ভব হতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন। প্রবীণদের প্রদত্ত তথ্যমতে, বর্তমানে রক্ষিত বাড়িটিতে আগে পাকা নির্মিত একটি বৈঠকের জায়গা ছিল যা ইতিপূর্বে ১৯৯৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার সময় হারিয়ে গেছে। তাছাড়া আগে বাড়ীটির উত্তর দিকে একটি পুকুর ছিল যা জাফলং পিয়াইন নদী পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। বর্তমানে তা ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন খাসিয়া ব্যক্তিদয়ের কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে ভোগ দখলে রেখে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন, রাস্তা আর ব্যবসায়িক অবকাঠামো তৈরির ফলে সেখানে আর সাবেক কালের  মূল রাজবাড়ীটির কোনো নিদর্শনই দেখা যায়না। রাজবাড়ীর মূল ঘরের ধ্বংসাবশেষের কাছে প্রচুর ইট-সুরকি ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে যা বাড়িটির প্রাচীনত্বের ইঙ্গিত প্রদান করে। প্রত্নতাত্তিক খননকাজের মাধ্যমে এ রাজবাড়ীর প্রাচীনত্বের পাশাপাশি আরো  অনেক অজানা নানা দিক ও বিষয়বস্তু উদঘাটিত হতে পারে। মূল রাজবাড়ীটি বর্তমানে এক সুরক্ষিত পান-সুপারির জুমের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় এখানে যে দেয়ালসহ রাজবাড়ীর অবস্থান আছে, তা যে কারো দেখা তো দূরের কথা, অনুমান করতেও কষ্ট হবে। তাছাড়া বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ ও চতুর্দিকে পান-সুপারির গাছ রোপণ এবং আগাছার কারণে বাড়িটিতে এক নিভৃত নিস্তব্ধ ভুতুড়ে পরিবেশ বলবৎ রয়েছে। এতে ভেতরে ঢুকেও জায়গাটিকে চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য কাজ।

জাফলংয়ের সামাজিক সংগঠন প্রজন্ম জাফলংয়ের সভাপতি রিপন আহমদ জানান, এটা পুরো জাফলংয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে, সরকারের উদ্যোগে তা দ্রুত সংস্কারসহ রক্ষা করা জরুরি। সরকারি উদ্যোগে এই সম্পদ রক্ষা সংস্কার করা হলে জাফলংয়ে ভ্রমণে আসা পর্যটক, দর্শনার্থীরাও আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ে ইতিহাস ঐতিহ্য সম্বন্ধে জানতে পারবেন।

Logo


© ২০১২ সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

BTL Ltd

ফোনঃ ৯৫৭১৬২৫

সম্পাদক:
যোগাযোগ: ৫১/৫১ এ রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১০ম তলা), ঢাকা
ই-মেইলঃ news@somoy24.com,
toprealnews24@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি