সময় ll সিলেট জেলার পর্যটনসমৃদ্ধ জাফলং এলাকাকে শিগগিরই ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এ ঘোষণার ফলে এলাকাটি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই ওই অঞ্চলের টিলার আশপাশ থেকে কোনো পাথর উত্তোলন করা যাবে না। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুরো এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে।

ওই অঞ্চলটি ইওসিন যুগের। তাই এর ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। ‘ইওসিন’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘ইওস’ থেকে, বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘সূচনা’। ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে সিনোজোয়িক মহাযুগের প্রথম যুগ প্যালিওজিনের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে ইওসিন উপযুগ। সময়ের হিসাবে আজ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে থেকে শুরু করে ৩ কোটি ৩৯ লাখ বছর আগের সময়সীমাকে ‘ইওসিন উপযুগ’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ ধরনের উপযুগের সময়সীমা সাধারণভাবে ভূতাত্ত্বিক, আবহাওয়া ও জীবাশ্মবিদ্যাগত ঘটনাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে যত প্রকার পাললিক শিলার স্তর রয়েছে; তার প্রায় সবগুলো এই অঞ্চলে।

জাফলংকে ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় চলতি সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে জাফলংকে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করবে।

ভারতের মেঘালয় পর্বতের উভয় তীরের ভূ-প্রকৃতিতে সমৃদ্ধ এই এলাকাটি বিনোদনের জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। এখানে রয়েছে বড় বড় টিলা ও নদীতে চুনাপাথর; কিন্তু অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডাউকি নদী থেকে পাথর তোলায় এই এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। এ অবস্থায় এলাকাটি রক্ষায় একে ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে এটিই হবে প্রথম এ ধরনের সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে সাধারণত বন বিভাগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বনরক্ষায় বিভিন্ন বন সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করে থাকে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী সময়কে বলেছেন, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং এলাকাটি বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ভূতত্ত্ববিদরা এ এলাকাকে বাংলাদেশের ভূতাত্তি¦ক জাদুঘর বলে থাকেন। বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে যত প্রকার পাললিক শিলার স্তর রয়েছে; তার প্রায় সবগুলো এই অঞ্চলে।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির অন্যতম এলাকা হিসেবে সিলেটের জাফলং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। পাশাপাশি আগামী প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এলাকাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এখানকার ভূ-প্রকৃতির সম্পদ হুমকির মুখে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ‘ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য’ ঘোষণা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাফলং এলাকায় চুনাপাথরের স্তরসহ কয়েকটি অতি পুরনো পাললিক শিলার স্তর ডাউকি নদীর পারে একটি টিলায় উন্মুক্তভাবে রয়েছে। এ ধরনের স্তর বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ অঞ্চলে ফিল্ডওয়ার্ক করে থাকেন। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে গবেষণার কাজেও ইওসিন উপযুগের শিলাস্তরগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৯ সালে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের এক পরিচালককে আহ্বায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ, সিলেট জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভূমি অধিগ্রহণসহ অনান্য প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করে ওই এলাকাকে ‘সংরক্ষিত’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয় সভায়।

সর্বশেষ গত বছর মার্চে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যানকে এ সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়। পরবর্তী সময়ে কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে সুপারিশ সংবলিত মতামত দেয়।

সুপারিশে বলা হয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশের ভূতাত্ত্বিক জাদুঘরের মতো এখানে একটি ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং সীমানা প্রাচীর করা যেতে পারে। আরও বলা হয়, অধিগ্রহণ করা ২২ দশমিক ৫৯ একর জমিতে কোনো মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, বাড়িঘর বা অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নেই। এ কারণে এসব জমি অব্যবরিত রয়েছে। অধিগ্রহণকৃত জমি থেকে বিজিবির অনুকূলে ৩ একর জমি বাদ দিয়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের অনুকূলে জায়গা বরাদ্দ করা যেতে পারে। এটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ইওসিন উপযুগের উন্মুক্ত চুনাপাথরের স্তরসমৃদ্ধ এলাকা সংরক্ষণের জন্য ২০১৪ সালের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা যেতে পারে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, স্থানীয়ভাবে এ স্থানকে দেখভাল করার জন্য জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক ও অন্যান্য বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করছে। সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পর খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট জেলা প্রশাসক ও বিজিবি পদক্ষেপ নেবে।

Leave a Reply

  • (not be published)